শিক্ষা প্রশাসনের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ দফতর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সদস্যদের লোভনীয় পদ মাউশির মহাপরিচালক (ডিজি)। এ অধিদফতরেরই অন্যতম পরিচালক যিনি গত ১৫ বছরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলের অন্যতম সুবিধাভোগী। আ’লীগের পদলেহনকারী এ পরিচালক নিজেকে গত ৫ আগস্টের পর বিএনপি ঘরানার সদস্য হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তিনি এখন ভোল পাল্টিয়ে ডিজি হওয়ার চেষ্টা করছেন। যা শিক্ষা ক্যাডার সদস্যদের মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। গত ১৫ বছর চরমভাবে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী এ কর্মকর্তা মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রফেসর একিউএম শফিউল আজম। অথচ সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের
বাড়িতে হামলার পর মাউশি অধিদফতরের ৩৬ জন জুনিয়র কর্মকর্তা গত ৪ আগস্ট শিক্ষা ভবনে যে একটি মিছিল করেন সেটির অন্যতম প্রধান পরিকল্পনা ও অর্থদাতা ছিলেন এ শফিউল আজম। গত ৩ আগস্ট রাতে এ বিষয়ে অনলাইনে গোপন মিটিং মিছিল, আওয়ামী শক্তির শো ডাউন ও গত ৫ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী বিপ্লবী শিক্ষার্থীদের উপর আক্রমণের জন্য অস্ত্র মজুতসহ শিক্ষা ক্যাডারের ১৩৭ জন নিরীহ কর্মকর্তা যারা শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে বিপ্লবে সাহায্য করছিলেন। তাদেরকে বিপদে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের ডাইরেক্টর প্ল্যানিং শাখা শফিউল আজম (১৪তম বিসিএস), ডাইরেক্টর মাধ্যমিক শিক্ষা সৈয়দ জাফর আলী (১৭তম বিসিএস/সাবেক কুখ্যাত এমপি ও মন্ত্রী নানকের ডান হাত), ডাইরেক্টর রেজাউল করিম (১৪তম বিসিএস/বর্তমার ভারপ্রাপ্ত ডিজি/মাউশি), প্রশিক্ষণ শাখার ডাইরেক্টর প্রবীর চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী যিনি স্কুল শিক্ষক হয়েও মাধ্যমিক শাখার ডেপুটি ডাইরেক্টর হিসেবে শফিউল আজমের বিশ্বস্ত সঙ্গিনী, সেসিপ প্রকল্পের প্রকিউরমেন্ট কর্মকর্তা আনিসুর রহমান (২০তম বিসিএস), প্ল্যানিং শাখার সহকারী পরিচালক রওশন পান্না (২৪তম বিসিএস), তানভীর (সহকারী পরিচালক প্রশাসন/২৮ বিসিএস), উপ-পরিচালক বিপুল বিশ্বাস (১৮তম বিএস), কলেজ শাখার উপপরিচালক কিশোর মোহান্ত (১৮তম বিসিএস), উপপরিচালক বিশেষ শাখা তরিকুল ইসলাম (২৪তম বিসিএস), উপরিচালক প্রশিক্ষণ মোনালিসা খান (২৪তম বিসিএস), প্রশিক্ষণ শাখার সহকারী পরিচালক মুরাদ (২৮তম বিসিএস), আশেকুল হক রানা ও সহকারী পরিচালক, কলেজ ৪ শাখার রাহাত মাসুম, জাতীয় টেক্সট বুক বোর্ডের সচিব নাজমা আখতার ওরফে বিপ্লবী, একই দফতরের তার ডান হাত হিসেবে পরিচিত প্রাথমিক শাখার সহকারী বিশেষজ্ঞ মফিজুর রহমান ওরফে রতন (২৪তম বিএস) এবং পরের দিন ৪ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপারসনকে অপমানকারী ও বিপ্লবী শিক্ষার্থীদের হুমকি দিয়ে মিছিল করেন ৩৬ জন জুনিয়র কর্মকর্তা। এই ৩৬ জনের সবাই প্রাক্তন ছাত্রলীগ কর্মী ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের ও শিক্ষা ভবনের দ্বিতীয় ভবনে অবস্থিত হিসাব ও নিরীক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তা। গত ৩ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত অনলাইনে চলে এ মিটিং। গত ৪ তারিখ উক্ত ৩৬ জন কর্মকর্তাও যোগ দিয়ে পরের দিন গত ৪ আগস্ট ২০২৪ শিক্ষা ভবন এলাকায় আওয়ামী শক্তি প্রদর্শনের মহড়া দেখানোর দায়িত্ব নিয়ে মাঠে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয় যা তারা পালন করে বাস্তবে পরিণত করে রাতে।
এদিকে গত ৩ ও ৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের গোপনে মন্ত্রী নানকের কাছ থেকে সরকারের মদদে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশি অস্ত্র সংগ্রহ গড়ে তোলা হয় অস্ত্রের পাহাড়। হাসিনা সরকারের পুলিশ লীগ ও ছাত্রলীগের সরবরাহের এ অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হয়। প্ল্যানিং ডাইরেক্টর শফিউল আজম ও প্রকিউরমেন্ট কর্মকর্তা আনিস (২০তম বিসিএস), মাধ্যমিক শাখার পরিচালক সৈয়দ জাফর আলী, প্রশিক্ষণ শাখার পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী ও তদানীন্তন পরিচালক প্রশাসন রেজাউল করিমের কক্ষের বাথরুমে। অস্ত্র বহন ও লুকানোতে সহায়তা করে ব্যানবেইসের সহকারি পরিচালক প্রশাসন-১ হাবিবুর রহমান, ব্যানবেইসের সহকারী পরিচালক প্রশাসন-২ সাবেক মাহমুদ রিফাত (এরা দুজনেই দীপু মনির ক্যাডার হিসাবে অর্থ সংগ্রহের কাজ করতো এবং শিক্ষা ক্যাডারের মাফিয়া নামে অভিহিত। পরে এরা নওফেলের সাথে যোগদান করে) এবং মাউশির সে সময়ের সহকারী পরিচালক প্রশাসন তানভীর ও সদস্য প্রাক্তন সহকারি পরিচালক প্রশাসন রুপক রায়। এদের ছাত্রলীগের পুলিশ শাখার মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ করার ও লুকিয়ে রাখার কাজে নেতৃত্ব দেয় ১৬তম বিএস-এর মিজানুর রহমান, তদানীন্তন সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের শিক্ষা, বাংলা কলেজ। ইনি আজীবন তার স্ত্রী জাহিদা নাজনীন (একটি প্রজেক্টের ডাইরেক্টর)সহ শিক্ষা ভবনেই জীবন কাটান। প্রথমে দীপু মনি ও পরে নওফেলের কাছের লোক হিসেবে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বঙ্গবন্ধু জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির উপপরিচালক ছিলেন। কঠোরভাবে আওয়ামী পন্থী এ অতি ধূর্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিষ্ঠুরতার প্রতীক গ্রুপটির একিউম শফিউল আজমের নেতৃত্বে পরিকল্পনা ছিল এমন যে, গত ৫ আগস্ট এ আগ্নেয়াস্ত্রগুলো নিয়ে এ ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত নারী কর্মকর্তাসহ সকল কর্মকর্তা। ইন্সপেকশন এন্ড অডিট এ শিক্ষা পরিদর্শক হিসেবে। সেখানে তার সীমাহীন দুর্নীতির খবর সংবাদ মাধ্যমে চলে নিরীক্ষা ও হিসাব অধিদফতর হতে দুদকের ঝামেলায় পড়ার ভয়ে জুন ২০২৪-এ গোপালগঞ্জে আশ্রয়ের নামে পদায়ন নেন আকতার তার স্ত্রী ও ব্যাচমেন্ট (১৮তম বিসিএস) ব্রাহ্মণবাড়িয়া মানুষ হওয়ার শেখ হাসিনার কুমন্ত্রণার হোতা মন্ত্রী রবিউল, মন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও সাবেক শিক্ষা ডিজি ফাহিমা খাতুনের নিজস্ব লোক হিসেবে ঢাকা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগে পদায়ন নেন। স্বামী ও স্ত্রী একই দিনে একই বদলীর অর্ডারের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ দখল করেন। শামীম আকতার ঢাকা কলেজে আওয়ামী দুর্গ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন এবং জুলাই বিপ্লবে ঢাকা কলেজের ছাত্র হত্যার নেপথ্যে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দেন।
আমীরন আলী (১৪ বিএস) ডাকরেক্টর এডমিন) নায়েম এখানে বহু বছর শেকড় গেড়ে বসা আওয়ামী মুখপাত্র। এর আগে শিক্ষা ভবনের ডাইরেক্টর কলেজ হিসেবে আসার জন্য তিনি তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে সৈয়দপুর বিজ্ঞান কলেজের ফান্ড থেকে ৮৫ লক্ষ টাকা ঘুষ প্রদান করেন। এরপর দীপু মনিকে প্রচুর ঘুষ দিয়েও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ইসকন নিয়োজিত দু’জন জয়েন্ট সেক্রেটারি শ্রীকান্ত (১৬ বিসিএস) আর জয়েন্ট সেক্রেটারি মুকেশকে দিয়ে নায়েমের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ ডাইরেক্টর এডমিন পদে যোগদান করে।
দীপু মনির একান্ত আস্থাভাজন প্রাক্তন ডিজি নায়েম ও বর্তমান চেয়ারম্যান কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড নিজামুল করীম (১৪ বিসিএস) ও নন ক্যাডার প্রাক্তন নায়েম ডাইরেক্টর আতিকুল হক পাঠান। নিজানুর রহমান (১৬ বিসিএস/বিষয়-ইসলামের শিক্ষা) সরকারি বাংলা কলেজ। মিজানুর রহমান ২০১২ সাল শিক্ষা ক্যাডারে সাদা রফিক নামে পরিচিত ৭ম বিএসএস-এর কুখ্যাত আওয়ামী পন্থী কর্মকর্তার সাথে বিদ্যালয়ে আসবাব সরবরাহের একটি প্রজেক্টে এডি হিসেবে কাজ করার সুবাদে কোটি কোটি টাকা তসরুফ করার পরেও আওয়ামী পন্থি বলে কোনো সমস্যায় পড়েনি। ইতোমধ্যে তার স্ত্রী জাহেদা নাজনীন (১৭ বিসিএস)কে প্রজেক্টের সহকারী পরিচালক হিসেবে নিয়ে আসে। দু’জনে দুই প্রজেক্টে প্রচুর দুর্নীতিতে শামিল হয়। এরপর সে পরবর্তীতে সে শিক্ষা ভবনে মাধ্যমিক পর্র্যায়ের বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প বলে আরেকটি প্রকল্পে উপপরিচালক হিসেবে যোগদান করে। কিন্তু এখানে এমদাদুল কবীর নামক আরেকজন কর্মকর্তার দাপটে টিকেতে না পেরে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ডিডি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শতবার্ষিকী উদযাপন প্রকল্পে যোগ দেয় এবং দীপ মনির আপন লোক হয়ে ওঠে। দীপু মনি ২০২০ সাল থেকে মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে মাতৃভাষায় অফিস করতে থাকে সহজে অবৈধ টাকা গ্রহণ করার সুবিধার্থে। আর এই মিজানুর রহমান তার এই অবৈধ রোজগারের ব্রিজ হিসেবে কাজ করে। পরে দীপু মনি তার ঘুষের টাকা মিজানুর রহমান আত্মসাৎ করেছে বুঝতে পেরে বরিশালে পদায়ন দিয়ে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থেকে সরিয়ে দেয়। দীপুমনির পরিবর্তে নওফেল মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতায় এলে মিজান এবার তার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে সরকারি বাংলা কলেজে পদায়ন নেয়। কয়েকদিন আগে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নিয়ে সে এখন শিক্ষা ভবনে ডাইরেক্টর অথবা কোনো প্রজেক্টে পিডি হওয়ার চেষ্টা করছে।
এরা শিক্ষা ক্যাডারে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ ঘরানার কর্মকর্তা ও নন ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়ে সরকার উৎখাতের গভীর নীল নকশায় ব্যস্ত। লোকজনের নজর এড়ানোর জন্য এরা নায়েমের ডিজি তাহমিনা ও শিক্ষা ভবনের দ্বিতীয় ভবনে অবস্থিত ডাইরেক্টরেট অফ অডিট এন্ড ইনসপেকশনে বিএনপির সহায়তায় পদায়ন পাওয়া ডাইরেক্টর কাজী আবু মোঃ কাইয়ুম শিশির (১৪ বিসিএস)-এর কক্ষে নিয়মিত মিটিং করছে। এর আগে এরা অফিসার্স ক্লাবে কয়েকদিন বৈঠক করে। রাত গভীর হলে এরা কাজী আবু কাইয়ুম শিশিরের সাথে মিটিং করে। কাজী কাইয়ুম শিশির পেশাগতভাবে কর্মকর্তা কাম ব্যবসায়ী বেশি বলে পরিচিত। অত্যন্ত কুৎসিত চরিত্রের এই লোক টাকার জন্য শুধু দল নয়, সবকিছুই করতে পারে বলে কথিত আছে।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এরা প্রায় প্রত্যেকে ১৪তম বিসিএস কর্মকর্তা এবং বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টারত। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের ডাইরেক্টর প্ল্যানিং শফিউল আজম হচ্ছে এদের থিংক ট্যাঙ্ক ও প্রধান মদদ দাতা। কাজেই বিপ্লবী সরকারকে প্রতি বিপ্লবের বিপদমুক্ত থাকতে হলে শফিউল আজমসহ এদের সবাইকে শুধু অন্যত্র পদায়ন নয়, কঠোর তদন্ত ও বিচারে মুখোমুখি আশু প্রয়োজন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

ফ্যাসিস্ট সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী
মাউশির পরিচালক শফিউল আজমের নানা অনিয়ম
- আপলোড সময় : ২১-১১-২০২৪ ১২:১২:৪৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২১-১১-২০২৪ ১২:১২:৪৭ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ